ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে জয়পুরহাটের কালাইয়ে চলছে চরম বাণিজ্য।
সুবিধাভোগীদের জন্য বিনামূল্যে বরাদ্দকৃত এসব ঘর নামমাত্র টাকার বিনিময়ে একের পর এক বিক্রি করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। বাস্তবে টাকার লেনদেন হলেও, আইনি জটিলতা এড়াতে কাগজে-কলমে তা 'দানপত্র' হিসেবে দেখিয়ে প্রশাসনকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের কাটাহার গ্রামের মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে এমন গুরুতর অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাটাহার আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত জিয়া নামের এক সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে একই ঘর একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
কিছু দিন আগে কালাই পৌর এলাকার সাখাওয়াত নামের এক বাসিন্দার কাছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় ঘরটি বিক্রি করেছিলেন জিয়া। পরে তার কাছ থেকে ঘরটি ফেরত নিয়ে সম্প্রতি রুবেল হোসেন ও মৌসুমী দম্পতির কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পুনরায় বিক্রি করেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি ও স্থানীয় গ্রামবাসী মিলে ওই ঘরটিতে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সরকারি ওই ঘরটির নতুন ক্রেতা রুবেল হোসেন টাকা দিয়ে ঘর কেনার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, "ঘর কেনার বিষয়টি সত্য। আমাদের থাকার কোনো জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ঘরটি কিনেছি। তবে আইনি ঝামেলার কারণে কাগজপত্র 'দানপত্র' হিসেবে করা হয়েছে।"
অন্যদিকে, অভিযুক্ত জিয়ার দাবি সম্পূর্ণ উল্টো। টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, "আমি ঘর বিক্রি করিনি এবং কোনো টাকাও নিইনি। দানপত্রের মাধ্যমে ঘরটি তাদের দিয়েছি, এখানে বিক্রির কোনো বিষয় নেই।"
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত সুবিধাভোগী নোয়াব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার আমাদের মতো গরিব মানুষের মাথা গোঁজার জন্য ঘর দিয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে গোপনে সেই ঘর বিক্রি করে দিচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।"
আরেক বাসিন্দা রিনি বেগম বলেন, "অল্প টাকার লোভে অনেকেই সরকারি ঘর বিক্রি করছে। জিয়াও তার ঘর বিক্রি করেছে বলে আমরা শুনেছি।"
কাটাহার গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাদেক আলী বলেন, "সরকারি ঘর বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি জানার পর যাতে আর কোনো অনিয়ম না হয়, সেজন্য আমরা গ্রামবাসীকে নিয়ে ঘরটি তালাবদ্ধ করেছি এবং প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি।"
সরকারি ঘর বিক্রির এই মহোৎসব সম্পর্কে জানতে চাইলে কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, "আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনোভাবেই বিক্রয়যোগ্য নয়। অভিযোগের বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।
তদন্তে এর প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঘরটি প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।"
স্থানীয়রা জানান, শুধু জিয়াই নয়, এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে আরও অনেকেই ঘর বিক্রির সাথে জড়িত। অভিযুক্ত জিয়ার শ্বশুর আব্দুল ওহাব এবং সাইদুল নামের আরও দুই সুবিধাভোগী ইতোমধ্যে তাদের নামে বরাদ্দকৃত ঘর বিক্রি করে দিয়েছেন এবং বর্তমানে সেখানে অন্য পরিবার বসবাস করছে।
প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই সরকারের এমন একটি মহতী উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।