সভাপতি পদ থেকে সরাতে মনস্তাত্ত্বিক চাপ, শেষে পরিকল্পিত হত্যা, রুনার পরিবারের অভিযোগ

ক্যাম্পাস
সভাপতি পদ থেকে সরাতে মনস্তাত্ত্বিক চাপ, শেষে পরিকল্পিত হত্যা, রুনার পরিবারের অভিযোগ
১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৩১ পিএম

সাম্প্রতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিজ কক্ষে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমানের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। এটি একটি ‘পরিকল্পিত হত্যা’ এবং তাঁকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দিতে বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা চেষ্টা করেছিলেন, এমন অভিযোগ করেছেন নিহত শিক্ষিকার পরিবার।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত শিক্ষিকা যখন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখনও তাঁকে চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়নি। শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকার দায়িত্বে না থাকলেও তিনি এবং শিক্ষিকা মমতা মোস্তারী মিলে প্রায় এক থেকে দেড় মাস রুনাকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে দেননি।

এছাড়া, শিক্ষিকা নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে রুনাকে কাজে চরম অসহযোগিতা করা হয়। ফলে তিনি সভাপতি পদ থেকে সরে আসার কথাও ভাবছিলেন। বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকরাও তাঁকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে হ্যারাসমেন্ট করে পদ থেকে সরাতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীতে প্রশাসনের নির্দেশে রুনা দায়িত্ব গ্রহণ করে চেয়ারে বসেন। সাধারণত পূর্ববর্তী চেয়ারম্যান, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শাহিনুর রহমান সকল ভাউচার ও কাগজপত্র শিক্ষক শ্যামের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু পরবর্তীতে শ্যাম রুনাকে কোনো ডকুমেন্টস দেননি। তৎকালীন প্রশাসন শ্যামের পক্ষ নিয়ে সাদিয়াকে কটু কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল “সে তোমাকে হিসাব দিচ্ছে না, তাতে তোমার সমস্যা কী? সেটা শ্যাম বুঝবে। তুমি যেখান থেকে দায়িত্ব পেয়েছ, সেখান থেকেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাও।”

এমতাবস্থায় রুনা ব্যাংক থেকে বিগত ছয় বছরের স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করেন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় চেয়ারম্যানের সময়কার আয়-ব্যয়ের হিসাব আলাদা করে বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় চেয়ারম্যানের সময়কার হিসাবে তিনি ব্যাপক গরমিল খুঁজে পান। পরে তিনি একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডেকে ভাউচার দেখতে চান। কিন্তু তখন তাঁকে বলা হয়, “ভাউচার ইচ্ছা হলে দেব, না হলে দেব না; আপনি কী করবেন?” এ কথা বলে দ্বিতীয় চেয়ারম্যান শ্যাম সরকার সভা থেকে বের হয়ে যান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ আট বছর ধরে এসব অসহযোগিতার কথা তাঁরা শুনে আসছেন। হাবিবুর রহমান বিভাগে যোগদানের পর ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও নথিপত্র তাঁকে দেওয়ার জন্য রুনাকে কয়েকবার অনুরোধ করেন। তাঁদের দাবি, মমতা, শ্যাম এবং বিশ্বজিৎ, এই তিনজনই মূলত চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত। শিক্ষিকা মমতা মোস্তারী যদি যুক্তরাষ্ট্রে না যেতেন, তবে তিনি এই মামলার দ্বিতীয় আসামি হতেন বলেও দাবি করেন তারা। এসব চক্রান্তের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মমতা। তাঁর চলে যাওয়ার পর শ্যাম ও বিশ্বজিৎ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

মাঝে রুনা সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগের চিন্তাও করেছিলেন বলে জানান পরিবার।
শ্যাম সুন্দরের এসব কর্মকাণ্ডের অন্যতম সমর্থক ছিলেন মমতা। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস সভাপতির সামনে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্য ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায়ই পা তুলে বসতেন এবং কোনো সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করতেন না।

এদিকে, সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ বিভাগীয় দায়িত্ব নতুন সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হকের কাছে বুঝিয়ে দেননি। মোজাম্মেল বিভাগে যোগ দেওয়ার পরও বিশ্বজিৎ তাঁর চেয়ার ছাড়েননি এবং দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি।
পরিবারের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশার অংশ এবং এমন একজন ব্যক্তিকে দিয়ে এটি করানো হয়েছে, যার জীবনের কোনো মূল্য নেই।

অন্য তিন আসামির গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন, “যদি তারা দোষী না হয়, তাহলে পালাচ্ছে কেন? তারা সরাসরি আত্মসমর্পণ করুক।”
থানা সূত্রে জানা গেছে, পলাতক আসামিদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশের সব ইমিগ্রেশন পয়েন্টে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। যেকোনো সময় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ইমাম হোসাইন জানান, প্রধান আসামিকে এক সপ্তাহ আগে রেফার করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত। ঢাকায় সার্জারির জন্য পাঠানো হয়েছে। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তাঁকে স্থানান্তরে কিছু বিলম্ব হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, আসামি এখনো পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় রিমান্ডে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মেডিকেল ছাড়পত্র পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ৪ মার্চ বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির কক্ষে সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমানকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের স্বামী।

ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় ফজলুর রহমানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং বর্তমানে তিনি পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং মামলায় নাম আসায় দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তা এখনো পলাতক রয়েছেন।

সর্বশেষ

আরো পড়ুন
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের ৯, এনসিপির ২

সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের ৯, এনসিপির ২

রাজনীতি
মণিরামপুর বাজারে ফুটপাত দখল: ‘নয়া সংবাদ’-এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা

মণিরামপুর বাজারে ফুটপাত দখল: ‘নয়া সংবাদ’-এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা

আইন-আদালত
রাঙ্গামাটির চিৎমরং দূর্গম চাকুয়ায় কৃষি বিভাগের ফিল্ড টেকনোলজি ওরিয়েন্টেশন: অংশ নিলেন ৫০ জন কৃষক।

রাঙ্গামাটির চিৎমরং দূর্গম চাকুয়ায় কৃষি বিভাগের ফিল্ড টেকনোলজি ওরিয়েন্টেশন: অংশ নিলেন ৫০ জন কৃষক।

সারাদেশ
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে যুবক খুনের ঘটনায় গ্রেফতার ১

হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে যুবক খুনের ঘটনায় গ্রেফতার ১

আইন-আদালত
ঠাকুরগাঁওয়ে পোল্ট্রি ফার্মে বিষ প্রয়োগ, তিন হাজার মুরগীর মৃত্যু

ঠাকুরগাঁওয়ে পোল্ট্রি ফার্মে বিষ প্রয়োগ, তিন হাজার মুরগীর মৃত্যু

অপরাধ ও দুর্নীতি
যশোরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে মণিরামপুর বিএনপির যৌথ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

যশোরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে মণিরামপুর বিএনপির যৌথ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

সারাদেশ
১৩ সংরক্ষিত নারী আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত, তালিকায় শহীদের মা ও শরিক নেতৃবৃন্দ

১৩ সংরক্ষিত নারী আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত, তালিকায় শহীদের মা ও শরিক নেতৃবৃন্দ

জাতীয়

ক্যাম্পাস এর আরও সংবাদ

আরো পড়ুন