উল্লাপাড়ার কালিকাপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারগুলোর হালচাল
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কালিকাপুরের সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারগুলো কৃষি পেশায় আছেন। এদের নিজেদের আবাদি জমি জিরেত নেই বললেই চলে। এরা কৃষি কাজে দিন হাজিরায় মজুরি বেচেন। এলাকায় অন্যের জমিতে মজুরি খাটেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা মাঠের কৃষি কাজে মজুরি খাটেন। কাজের সময় কাজ আর কাজ না থাকলে বাড়ীতে নিজেরা আড্ডা গল্পে সময় পার করেন। বসতভিটে বাড়ী না থাকা কয়েকজন অন্যদের ভিটেয় বসতঘর তুলে বসবাস করছেন। এদের মাঝে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করানোয় আগ্রহ বাড়ছে। সংসারে কিছুটা অভাবের মাঝে এদের জীবন যাপনে বদল আসছে। এদের গোত্রের সবাই যেন এক পরিবার হয়ে বসবাস করছেন।
উল্লাপাড়ার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের উত্তর কালিকাপুরে রায় পদবীর ২৪ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবার বসবাস করছেন। এখানে বংশীয় পরম্পরায় পরিবারগুলো বসবাস করছেন। এরা কাগজ কলমে রায় পদবীর হলেও নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বলে জানান। এদের পূর্ব পুরুষেরা কৃষি পেশায় কাজ করেছেন। সে সময় এদের ( পূর্বপুরুষদের ) কারো কারো দেড় দুবিঘা করে আবাদি জমি ছিলো বলে জানানো হয়। এখন কারো তেমন আবাদি জমি জিরেত নেই। হয় দরকারে বেচেছেন নয়তো ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে বলে জানা গেছে। এদের আছে বসতবাড়ি । আবার বসতভিটে কয়েকজনের নেই। নিজের বসতভিটে না থাকা কয়েকজন হলেন - শ্যামল রায় , স্বদেশ রায় , রাম রায় , নিত্য রায় , গৌতম রায় , কোমেদ রায়।
সরেজমিনে উত্তর কালিকাপুরে গিয়ে সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের নানা বয়সের আট থেকে দশ জন নারী পুরুষের সাথে কথা বলে এদের হালচাল , জীবনযাপনের সুখ দুখের , কম বয়সী ছেলে মেয়ে সন্তানদের পড়ালেখা করানো , বসতভিটে না থাকাদের বেদনার অনেক কিছুই জানা গেছে। কৃষি পেশায় মাঠের কাজে মজুরি বেচেন এমন দুজন রাম রায় , সুজন রায় বলেন ছোটো বেলা থেকেই মাঠের কাজে মজুরি খাটেন। তাদের সাথে তাদের গোত্রের আরো অনেকেই কৃষি কাজে মজুরি খাটেন। সেই আগে থেকেই তাদের ঘরের নারীরা মাঠের কাজে মজুরি খাটেন বলে জানিয়েছেন। রাম রায়ের স্ত্রী কল্পনা রায় বলেন তিনি এলাকায় নানা ফসলের আবাদকালে মাঠের কাজে মজুরি বেচেন। তাদের গোত্রের পুরুষদের পাশাপাশি তারা ( নারীরা ) কাজ করেন বলে জানান। রাম রায় ও কল্পনা রায় দম্পতির ঘরে দুছেলে সন্তান ও এক মেয়ে সন্তানের মধ্যে পড়ালেখায় এসএসসি পাশের পর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আর ছেলে সন্তান দুজন কৃষি কাজে মজুরি বেচা আর কৃষি কাজ না থাকলে দিন আয়ে অন্য কাজে মজুরি খাটে বলে জানানো হয়। তাদের এক ভাতিজি এসএসসি পাশের পর বিয়ে দিয়েছেন। নন্দ লাল রায় বলেন বয়সের কারণে তিনি আগের মতো বেশি খাটনির কাজ করতে পারেন না। এরপরও পেটের খাবার জোটানো আর সংসারের দরকারে কাজ করেন। তার বোন অরুণা রায় নিজের সংসারের অভাবের কথা জানান।
উল্লাপাড়া সদর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দুরের সেখানে সরেজমিনে গিয়ে আরো জানা গেছে উত্তর কালিকাপুরের সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের সবাই সন্তানদের পড়ালেখা করানোয় আগের দিনের চেয়ে এখন অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছেন। তাদের আগ্রহ ইচ্ছে দিনে দিনে আরো বাড়ছে। পরিবারগুলোর প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা করার বয়সি সবাইকে পড়ালেখা করাতে এলাকার প্রাইমারি স্কুলে পাঠানো হয়। বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে এলাকার হাইস্কুলে পড়ালেখা করছে। নিজস্ব বসতভিটে বাড়ী না থাকা সুজন রায় ও আরো কয়েকজন বলেন তারা নিজেদের গোত্রের কারো কারো বসতভিটেয় বসতঘর তুলে বসবাস করছেন। এদেরকে মায়া মমতা দেখিয়ে জায়গায় বসতঘর তুলে থাকতে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এরা সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এক সাথে মিলেমিশে করেন বলে জানা গেছে । প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে গৃহবধু কল্পনা রায় ও পরিবার প্রধান পুরুষ কয়েকজন বলেন আর কয়েক বছর পর এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের নারীদের আর মাঠে কাজে দেখা যাবে না। অনেক পরিবার নতুন গৃহবধুদের মাঠের কাজে মজুরি খাটতে দেবেন না বলে জানানো হয়। মাঠের কাজে মজুরি খাটতে পুরুষদের দেখা গেলেও বছর ঘুরে আসতেই মজুর কমবে বলে তারা মনে করছেন। বয়স বেশি হবে কারণে কেউ কেউ আর মজুরি খাটবেন না। পুরুষদের অনেকেই সংসারের দরকারে কৃষি পেশায় ভরা মৌসুম কালে মজুরি খাটবেন। আর মাঠে কাজ না থাকলে হয়তো অন্য সময় দিন আয়ে অন্য কাজে মজুরি খাটবেন। সেলুনে , দোকানে , রাজমিস্ত্রী কাজে মজুরি খাটবেন বলে জানানো হয়।
আপনার মতামত লিখুন